• সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৩২ পূর্বাহ্ন
Headline
ভূরুঙ্গামারী হাসপাতালে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় শিশু রোগী ও অভিভাবকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ভাঙা-গড়ার খেলায় চরের জীবন: কুড়িগ্রামের নদীভাঙন, মানুষের সংগ্রাম ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত হরমুজকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ ঘোষণা করে মানচিত্র প্রকাশ ট্রাম্পের রাজারহাটে বিএনপির আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ রাজারহাটে হত্যা মামলার আসামিসহ ৫ জন গ্রেফতার কুড়িগ্রামের পুলিশ-বিজিবির যৌথ অভিযানে ভারতীয় মোবাইলের বড় চালান জব্দ: আটক এক কুড়িগ্রামে স্বেচ্ছাসেবক দলের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত মন্ত্রিসভায় নতুন ৪ মন্ত্রী ও ২ প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন ও রদবদল করে প্রজ্ঞাপন জারি ভূরুঙ্গামারীতে দুইজন সার ব্যবসায়িকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমান আদালত উলিপুরে পুকুরে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু, আহত আরও এক

ভাঙা-গড়ার খেলায় চরের জীবন: কুড়িগ্রামের নদীভাঙন, মানুষের সংগ্রাম ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

মোঃ আসাদুজ্জামান / ৪০ Time View
Update : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। নদী আমাদের সভ্যতার জন্ম দিয়েছে, কৃষিকে করেছে সমৃদ্ধ; আবার একই নদী প্রতি বছর হাজারো মানুষের জীবনে বয়ে আনে সীমাহীন দুর্ভোগ। এই দ্বৈত বাস্তবতার সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেদনাময় প্রতিচ্ছবি কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল। এখানে নদী কেবল একটি জলধারা নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা, স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং পুনর্জন্মের প্রতীক।
উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা কুড়িগ্রাম ১৬টি নদ-নদীর প্রবাহে গড়ে ওঠা এক অনন্য ভূখণ্ড। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমারসহ অসংখ্য নদীর বয়ে আনা পলিতে সৃষ্টি হয়েছে শত শত চর। এসব চর কখনো জেগে ওঠে, আবার কখনো নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। প্রকৃতির এই চিরন্তন ভাঙা-গড়ার মাঝেই প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ তাদের জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বসবাস করছে।
চরের মানুষের কাছে নদী যেমন আশীর্বাদ, তেমনি অভিশাপও। একদিকে নদীর পলিমাটি কৃষিকে করে তোলে অত্যন্ত উর্বর; অন্যদিকে বর্ষার উন্মত্ত স্রোত মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন করে দেয় বহু বছরের গড়ে তোলা বসতভিটা। প্রতিবছর হাজারো পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। তবুও তারা থেমে যায় না। নদীর বুক থেকে জেগে ওঠা নতুন চরে আবার ঘর তোলে, জমি চাষ করে, সন্তানদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে। এই অদম্য মানসিক শক্তিই চরবাসীর সবচেয়ে বড় সম্পদ।
চরাঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম কেবল নদীভাঙনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা এখনও সর্বত্র সমানভাবে পৌঁছায়নি। বর্ষাকালে অনেক বিদ্যালয় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হয়। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে নদী পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়। উন্নয়নের এই বৈষম্য দূর করা আজ সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে চরকে যদি শুধু দুর্যোগের জনপদ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার প্রকৃত সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা হবে। নদীর পলিতে গঠিত উর্বর জমি দেশের অন্যতম উৎপাদনশীল কৃষি অঞ্চল হতে পারে। চিনাবাদাম, ভুট্টা, মিষ্টি আলু, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, ডাল, তিল এবং বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি এখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উৎপাদিত হয়। একই সঙ্গে বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক চারণভূমি গবাদিপশু পালনকে করেছে লাভজনক। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং বাজারব্যবস্থা উন্নত করা গেলে চরাঞ্চল দেশের কৃষি অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
চরাঞ্চলের উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। টেকসই নদীশাসন, ভাঙন প্রতিরোধ, বন্যাকালে মানুষ ও গবাদিপশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সহজ নৌ-যোগাযোগ, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে চরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, জলবায়ু অভিযোজন এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
চরের মানুষ কোনো বোঝা নয়; তারা বাংলাদেশের উন্নয়নের এক বিশাল সম্ভাবনার বাহক। তাদের শ্রম, সাহস, অভিযোজনক্ষমতা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা আমাদের জন্য অনুকরণীয়। রাষ্ট্র যদি তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং উন্নয়নের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে, তবে চরাঞ্চল কেবল খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং টেকসই উন্নয়নের এক শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হবে।
কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল আমাদের শেখায়—জীবন কখনো শুধু ভাঙনের গল্প নয়; প্রতিটি ভাঙনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন করে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা। নদী যতবার ভেঙেছে, চরবাসী ততবার নতুন স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অদম্য প্রাণশক্তিই বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি। তাই চর উন্নয়ন মানে শুধু একটি অঞ্চলের উন্নয়ন নয়; এটি সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি অপরিহার্য অঙ্গ।

লেখক: অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, কুড়িগ্রাম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা